কক্সবাংলা ডটকম(২৩ ডিসেম্বর) :: জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান ছিল রাষ্ট্র ও সমাজের এক গভীর রূপান্তরের ডাক। মানুষ রাস্তায় নেমেছিল ক্ষোভ, আশা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায়।
কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষার পথ ধরেই বাংলাদেশ শুরু হয়েছে ভয়ংকর, অস্বস্তিকর এক অধ্যায়ে- মব সন্ত্রাস। আইন ও ন্যায়বিচারের জায়গা দখল করে নিচ্ছে উত্তেজিত জনতা, আর রাষ্ট্র ক্রমেই পরিণত হচ্ছে নীরব দর্শকে।
এই প্রবণতা শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার সমষ্টি নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকেত। প্রশ্ন হলো, এই সহিংস ভিড় কারা, কেন তারা জন্ম নিচ্ছে, আর রাষ্ট্র কেন তাদের থামাতে পারছে না।
জুলাইয়ের পর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। চুরি বা ছিনতাইয়ের অভিযোগে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা, ধর্ম অবমাননার নামে বাড়িঘর ভাঙচুর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো তথ্যের ভিত্তিতে নির্দোষ মানুষকে শাস্তি দেওয়ার নজির এখন আর বিরল নয়।
কোথাও মসজিদ প্রাঙ্গণে, কোথাও বাজারে, কোথাও আবার থানার কাছেই মানুষ নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়েছে, ধ্বংস করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনা, ভাস্কর্য, মাজারসহ নানান স্থাপনা- যা রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই ঘটনাগুলোর ভয়াবহতা শুধু প্রাণহানিতে সীমাবদ্ধ নয়; এগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, আইন নিজের জায়গা হারাচ্ছে, আর জনতার আবেগ হয়ে উঠছে বিচারক।
একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত অবস্থা বোঝা যায় কয়েকটি জায়গায়, যার মধ্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কতটা নিরাপদ, আর সংখ্যালঘু নাগরিক কতটা সুরক্ষিত তা অন্যতম। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে এই দুই ক্ষেত্রেই গভীর উদ্বেগের ছবি সামনে এসেছে।
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের মতো প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমে হামলা এবং ময়মনসিংহে এক হিন্দু ব্যক্তিকে হত্যা করে মরদেহ পুড়িয়ে ফেলার ঘটনা আলাদা নয়; বরং একই সুতায় গাঁথা—সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা ও রাষ্ট্রীয় দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি।
১৮ ডিসেম্বর রাতে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ওপর সংঘটিত হামলাগুলো ছিল সরাসরি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। প্রতিষ্ঠান দুটিতে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটের ঘটনা ঘটেছে। ডেইলি স্টারে আটকে পড়া সংবাদকর্মীদের জীবন ছিল সঙ্কটাপন্ন, কেউ মারা যায়নি তবে যেতে পারতো।
অথচ এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবির সাথে দেশের দুটি প্রথম সারির গণমাধ্যমে এই বর্বরোচিত হামলার সম্পৃক্ততা সাধারণ জনগণের বোধগম্য নয়। বোধগম্য নয় ইংরেজি দৈনিক নিউ এইজের সম্পাদক বর্ষীয়ান সাংবাদিক নূরুল কবীরকে হেনস্তা ও সংগীত শিক্ষার অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠ ছায়ানট ভবনে ভাঙচুরের ঘটনা।
এই হামলাগুলোর পেছনে যে অসন্তোষ বা ক্ষোভের কথা বলা হচ্ছে, তা মূলত সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে। কোনও প্রতিবেদন, শিরোনাম বা সম্পাদকীয়কে ‘আপত্তিকর’ আখ্যা দিয়ে জনতার একটি অংশ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। প্রশ্ন হলো- যদি কোনও সংবাদে আপত্তি থাকে, তার প্রতিকার কি হামলা?
আদালত, প্রেস কাউন্সিল বা আইনি পথ উপেক্ষা করে মবের এই শক্তি প্রদর্শন আসলে এক ধরনের ভীতি সৃষ্টি করে, যার লক্ষ্য শুধু একটি সংবাদ নয়, বরং পুরো সাংবাদিক সমাজ।
নভেম্বরে মানিকগঞ্জে বাউলশিল্পী আবুল সরকারের ভক্তদের ওপর হামলার ঘটনা, সেপ্টেম্বরে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে ‘তৌহিদি জনতা’ পরিচয়ে নুরুল হক ওরফে ‘নুরা পাগলা’ এর মরদেহ কবর থেকে তুলে পোড়ানোর ঘটনা, আগস্টে রংপুরের তারাগঞ্জে দলিত সম্প্রদায়ের দুই ব্যক্তিকে ‘ভ্যান চোর সন্দেহে’ পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ‘তৌহিদী জনতা’ তথা ‘বিক্ষুব্ধ জনতা’ দাবির মুখে দিনাজপুর ও জয়পুরহাটে নারীদের ফুটবল ম্যাচ বন্ধ, মহিলা সমিতি মঞ্চে নাটক বন্ধ, নাটক ও চলচ্চিত্রের নারী তারকাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান বন্ধ, লালমাটিয়ায় দুই তরুণীকে লাঞ্ছিত করার মতো অসংখ্য ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে।
এবং এই মতামত লেখার সময় আগুন দেওয়া হলো উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর কার্যালয়ে হামলা ও আগুন দেওয়া হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের ৪টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। এর শেষ কোথায়?
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) কেন্দ্রের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় ৭৮, খুলনায় ১৯, রাজশাহীতে ১৪, রংপুরে ১২, সিলেট ৪, চট্টগ্রামে ৩২, বরিশাল ১৫ ও ময়মনসিংহে ১০ মোট ১৮৪ জন মব আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছে।
প্রশ্ন আসে, বাংলাদেশে নারী, ভিন্নমত প্রকাশকারী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এমনকি গণমাধ্যম কি স্বাধীন ও নিরাপদ? কখন ‘তৌহিদি’ কখন ‘বিক্ষুব্ধ’ জনতার নামে প্রতিনিয়ত এমন সহিংসতা! একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এর চেয়ে অশনিসংকেত আর কী হতে পারে।
মব ভায়োলেন্সের পেছনে মনস্তত্ত্বটা আসলে কী? এর পেছনে কাজ করছে বহুস্তরীয় মানসিকতা। দীর্ঘদিনের বিচারহীনতা মানুষকে শিখিয়েছে আইনের পথে ন্যায় পাওয়া কঠিন। সেই হতাশা থেকে জন্ম নেয় প্রতিশোধের তাড়না। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অর্ধসত্য মুহূর্তে আগুনে ঘি ঢালে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ক্ষমতার স্বাদ। রাষ্ট্র যখন দুর্বল, তখন ভিড় নিজেকে শক্তিশালী মনে করে।
লাঠি, ইট বা কণ্ঠের চিৎকারে মানুষ অনুভব করে এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ যা আসলে নৈরাজ্যেরই নামান্তর। অন্যদিকে সুশিক্ষার অভাব, অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী ও বাঙালির হুজুগে স্বভাবও দায়ী। সেই সাথে দীর্ঘদিনের এই অস্থিতিশীল পরিবেশ জনগণের মধ্যে ভায়োলেন্সকে নরমালাইজ করে ফেলেছে ফলে যে কোনও ইস্যুতেই সহজেই ভায়োলেন্সের পথ বেছে নিচ্ছে অনেকেই।
তবে গভীরে ভাবলে ও অনেক ঘটনার বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় সব ‘মব’ ভায়লেন্সই স্বতঃস্ফূর্ত নয়। কিছু ঘটনায় স্পষ্ট রাজনৈতিক ইন্ধনের গন্ধ পাওয়া যায়। প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে কোণঠাসা করা, নির্বাচন বানচাল, ক্ষমতার শোডাউন ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি দেখিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করার কৌশলও এতে জড়িয়ে থাকতে পারে।
বিদেশে অবস্থানরত কতিপয় ব্যক্তির সহিংসতার নিমিত্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ্য উসকানি ও নির্দেশনা, সেই সাথে দেশেরও একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তির পোস্ট তার প্রমাণ। ভিড় এখানে হাতিয়ার, আর সহিংসতা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক বার্তা। এই বাস্তবতা অস্বীকার করলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যাবে না।
জুলাইয়ের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ধীর, কখনও নীরব। অনেক ঘটনায় অপরাধের পর বিবৃতি এসেছে, কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নেই। পুলিশ ও প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতা স্পষ্ট- কখনও রাজনৈতিক চাপ, কখনও জনরোষের ভয়। রাষ্ট্র যখন শক্ত হাতে আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হয়, তখন সেই শূন্যস্থান দখল করে নেয় মব। সেই সাথে অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ‘মব’কে ‘প্রেশার গ্রুপ’ বলে ভ্যালিডেট করা আগুনে ঘি ঢালার সামিল।
মব ভায়োলেন্সের সবচেয়ে বড় ক্ষতি আস্থার জায়গায়। নাগরিকের রাষ্ট্রের ওপর আস্থা ভাঙছে, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। অর্থনীতির দিক থেকেও এর প্রভাব গভীর- বিনিয়োগকারীদের চোখে একটি অস্থিতিশীল, আইনহীন দেশের ছবি ফুটে ওঠে। বিশ্বে বাংলাদের নেতিবাচক ভাবমূর্তি চিত্রিত হয়। আর সামাজিকভাবে, হারাচ্ছে মানবিকতার বোধ; সহানুভূতির জায়গা দখল করছে সহিংসতা ও বিকৃত উল্লাস।
গণঅভ্যুত্থান মানুষের কণ্ঠস্বরকে জোরালো করেছিল, কিন্তু সেই কণ্ঠস্বর যদি সহিংসতায় রূপ নেয়, তবে তা বিপ্লব নয়, তা আত্মঘাতী বিশৃঙ্খলা। মব ভায়োলেন্স ঠেকাতে হলে অন্তর্বর্তী সরকারকে এখনই কঠোর ও ন্যায়ভিত্তিক অবস্থান নিতে হবে। দ্রুত বিচার, গুজব নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছাই পারে এই প্রবণতা থামাতে।
রাষ্ট্র যদি আবার তার জায়গায় ফিরে না আসে, তবে মবই শাসক হবে। আর মবের শাসন- ইতিহাস বলে, কখনই একটি দেশের জন্য শুভ পরিণতি বয়ে আনে না।
লেখক-শাকিলা জেরিন : সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী














